কুরআনে হযরত ঈসা (আ.): ইসলাম যিশু সম্পর্কে কী বলে?
কুরআনে হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? অলৌকিক জন্ম, নবী হিসেবে মর্যাদা এবং ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে যিশুকে নিয়ে মিল ও পার্থক্য।
কুরআনে হযরত ঈসা (আ.): ইসলাম যিশু সম্পর্কে কী বলে?
একটি সাধারণ ভুল ধারণা আছে যে মুসলমানেরা যিশু বা হযরত ঈসাকে অস্বীকার করেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কুরআনে হযরত ঈসা (আ.) এর নাম ২৫ বার উল্লেখ হয়েছে — মুহাম্মদ (সা.) এর নামের চেয়ে বেশি। তাঁকে নিয়ে রয়েছে বিস্তারিত আলোচনা, অলৌকিক গল্প এবং অসাধারণ গুণাবলির বর্ণনা।
তাহলে ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্মের পার্থক্য কোথায়? এবং মিলই বা কোথায়?
মরিয়মের গল্প: কুরআনে একটি অনন্য মর্যাদা
কুরআনে মরিয়ম (আ.) — যিশুর মাতা — এর নামে একটি সম্পূর্ণ সুরা আছে। সুরা মরিয়ম। বাইবেলে মেরির সম্পর্কে যতটুকু বলা আছে, কুরআনে তার চেয়ে বেশি বিস্তারিত বিবরণ আছে।
কুরআনে বলা হয়েছে যে মরিয়মকে সমস্ত নারীর মধ্যে বিশেষভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল। ফেরেশতা জিবরাইল তাঁর কাছে এসে বললেন: "হে মরিয়ম, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে বিশুদ্ধ করেছেন এবং সমস্ত নারীর মধ্যে তোমাকে মনোনীত করেছেন।"
মরিয়ম জিজ্ঞেস করলেন কোনো পুরুষ স্পর্শ ছাড়া সন্তান কীভাবে হবে। উত্তর এলো: "এটিই আল্লাহর নিয়ম — যা তিনি চান তাই সৃষ্টি করেন।"
এই বর্ণনা খ্রিস্টান বাইবেলের সাথে অনেকটা মিলে। উভয় ধর্মেই ঈসার জন্ম অলৌকিক।
কুরআনে ঈসার অলৌকিক কাজ
কুরআনে হযরত ঈসার বেশ কয়েকটি অলৌকিক কাজের কথা বলা হয়েছে।
তিনি মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি তৈরি করতেন এবং তাতে ফুঁ দিলে সেটি সত্যিকারের পাখি হয়ে উড়ে যেত — আল্লাহর অনুমতিতে।
তিনি অন্ধদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতেন — আল্লাহর অনুমতিতে।
তিনি কুষ্ঠরোগীদের সুস্থ করতেন — আল্লাহর অনুমতিতে।
তিনি মৃতদের জীবিত করতেন — আল্লাহর অনুমতিতে।
এই বর্ণনাগুলো বাইবেলের গসপেলের সাথে মিলে। পার্থক্য একটি — কুরআনে প্রতিটি অলৌকিক কাজের পরে বলা হয় "আল্লাহর অনুমতিতে।" এই অতিরিক্ত বাক্যটি ঈসার অলৌকিক ক্ষমতার উৎস নির্দেশ করে — তিনি নিজে ঈশ্বর নন, বরং ঈশ্বরের অনুমতি ও ক্ষমতার মাধ্যমে কাজ করেন।
"কালিমাতুল্লাহ" এবং "রূহুল্লাহ"
কুরআনে ঈসার দুটি বিশেষ উপাধি আছে যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।
প্রথমত, "কালিমাতুল্লাহ" — আল্লাহর কালাম বা বাণী। এই উপাধিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ খ্রিস্টান ধর্মে যিশুকে "লোগোস" বা বাণী বলা হয়।
দ্বিতীয়ত, "রূহুন মিনহু" — তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। এই উপাধিও অনন্য।
ইসলামী পণ্ডিতরা ব্যাখ্যা করেন যে এই উপাধিগুলো ঈসার অসাধারণ মর্যাদা প্রকাশ করে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি ঈশ্বর বা ঈশ্বরের অংশ।
প্রধান পার্থক্য: কে তিনি?
ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে হযরত ঈসাকে নিয়ে প্রধান পার্থক্য হলো তাঁর পরিচয়ে।
খ্রিস্টান ধর্মে ঈসা ঈশ্বরের পুত্র, ট্রিনিটির অংশ, এবং তাঁর মৃত্যু মানবজাতির পাপ মোচনের জন্য।
ইসলামে ঈসা একজন মহান নবী ও রাসুল, কিন্তু তিনি ঈশ্বর নন এবং ঈশ্বরের পুত্রও নন।
কুরআন বলে: "মসিহ ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রাসুল।" এটি একটি বিশাল সম্মান — রাসুল শুধু যে কাউকে বলা হয় না। কিন্তু এটি ঈশ্বরত্বের দাবি নয়।
কুরআন আরও বলে যে ঈসা নিজেই তাঁর উম্মতকে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ক্রুশবিদ্ধ হওয়া: মতভেদের কেন্দ্র
সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হলো ক্রুশ নিয়ে।
খ্রিস্টান বিশ্বাসে ঈসার ক্রুশবিদ্ধ মৃত্যু সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ঘটনা — কারণ এই মৃত্যুই মানবজাতির পাপ মোচন করেছে।
কুরআনে বলা হয়েছে: "তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশে বিদ্ধও করেনি — বরং তাদের কাছে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।" ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ তাঁকে তুলে নিয়েছেন।
এই মতভেদ সত্যিকারের এবং গভীর। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দুটি ধর্ম যিশুকে নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ঈসার প্রতি ভালোবাসা, তাঁর শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা — এটি উভয় ধর্মের মিলের একটি জায়গা।
শেষ জামানায় ঈসার প্রত্যাবর্তন
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত ঈসা (আ.) শেষ জামানায় পুনরায় আসবেন। তিনি মুসলমান হিসেবে আসবেন, দাজ্জালকে পরাজিত করবেন এবং পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।
এই বিশ্বাসটিও উল্লেখযোগ্য — ইসলামে ঈসা একজন জীবিত নবী যিনি আসার কথা রয়েছে।
একটি সেতু, একটি মতভেদ
হযরত ঈসাকে নিয়ে ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্মের মধ্যে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। তিনি উভয় ধর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরিচয়ের প্রশ্নে মতভেদ গভীর।
হয়তো এই মতভেদটি একটি সৎ কথোপকথনের সুযোগ — কোনো একজন কি এই প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন বিদ্বেষ ছাড়া, কৌতূহল নিয়ে?
চিন্তার জন্য প্রশ্ন
- কুরআনে এবং বাইবেলে ঈসার বর্ণনায় কী মিল আছে বলে আপনি মনে করেন?
- অলৌকিক জন্মের ধারণাটি আপনার কাছে কী বোঝায়?
- দুটি ধর্মের মধ্যে এই মতভেদ কি কখনো সেতু হতে পারে?
faq
কুরআনে হযরত ঈসার কতটি গুণ উল্লেখ আছে?
কুরআনে ঈসা (আ.) কে 'আল্লাহর কালাম', 'তাঁর পক্ষ থেকে রূহ', 'মসিহ' এবং 'মরিয়মের পুত্র' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গুণগুলো তাঁর অনন্য মর্যাদা প্রকাশ করে।
কুরআনে মরিয়ম (আ.) এর গল্প কী?
কুরআনে মরিয়মের নামে একটি সম্পূর্ণ সুরা আছে (সুরা মরিয়ম)। তাঁকে পবিত্র, ধার্মিক এবং ঈশ্বর-নির্বাচিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাইবেলের চেয়ে কুরআনে মরিয়ম সম্পর্কে বেশি বিস্তারিত আলোচনা আছে।
ইসলামে ঈসা (আ.) কি ঈশ্বরের পুত্র?
না। ইসলামে ঈসা (আ.) একজন মহান নবী ও রাসুল, কিন্তু ঈশ্বরের পুত্র নন। কুরআন বলে আল্লাহ 'কাউকে জন্ম দেননি এবং জন্মিতও হননি।'
ইসলামে ঈসার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কী বলা হয়?
কুরআনে বলা হয়েছে যে ঈসাকে হত্যা করা হয়নি এবং ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়নি, বরং আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
ইসলামে ঈসা (আ.) কি শেষ জামানায় আসবেন?
হ্যাঁ। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ জামানায় হযরত ঈসা (আ.) পুনরায় আসবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এটি ইসলামী এস্কাটোলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।